আহসান শামীমের মতে,
এই ৫টা বিষয় মনে রাখা উচিত
লজিস্টিক্স মানে শুধু ট্রাক চালানো নয়
মানুষ ভাবে লজিস্টিক্স মানে শুধু ট্রাক চালানো বা বাক্স পাঠানো। কিন্তু লজিস্টিক্স মানে হচ্ছে সঠিক জিনিস নেওয়া, সাবধানে রাখা, সেগুলো ঠিকমতো সাজানো এবং টাকা নিরাপদে ফেরত আনা। এটা একটা অনেক বড় কাজ।
কাজের প্রতি খুব সৎ ও সিরিয়াস থাকুন
বড় কোম্পানিগুলো যখন আপনার দরজায় আসে, তখন তারা আপনাকে মেসেজ এবং ছবি শেয়ার করে। আমাদের দেশে মাঝে মাঝে ডেলিভারি দেওয়া মানুষদের কাছে ব্যাগ বা সাইকেলও থাকে না। আবার কখনো কখনো তারা ডেলিভারির জিনিস চুরি করে বা বদলে ফেলে। আপনাকে সব সময় সৎ হতে হবে!
কঠোর পরিশ্রম নতুন রাস্তা খুলে দেয়
সেলস বা বিক্রির কাজে প্রতিদিন লড়াই করতে হয়। যখন অন্য মানুষ আরামে ঘুমায়, তখন আপনাকে রোদে বা বৃষ্টিতে কাজ করতে হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি খুব কষ্ট করেন, আপনার ক্রেতাদের খোঁজ নেন এবং নতুন সুযোগ খুঁজতে থাকেন, তবে ভালো কিছু অবশ্যই হবে।
অল্প কয়েকজন ভালো ক্রেতা রাখুন
অনেক বেশি ক্রেতা রাখার চেয়ে অল্প কয়েকজন ক্রেতা রাখা ভালো, যাদের আপনি খুব খুশি করতে পারবেন। যদি আপনার অনেক বেশি ক্রেতা থাকে, তবে আপনি সবাইকে ঠিকমতো সময় দিতে পারবেন না এবং কেউই খুশি হবে না। তাই অল্প কয়েকজন মানুষের খুব ভালো যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করুন।
ডেলিভারির জিনিসকে ছোট বাচ্চার মতো যত্ন করুন
যখন আপনি কাউকে কোনো জিনিস ডেলিভারি করবেন, তখন তা খুব সাবধানে ধরবেন, ঠিক যেমন আপনি একটা ছোট বাচ্চাকে কোলে নেন। কখনো কোনো বাক্স ছুঁড়ে মারা বা মাটিতে ফেলা উচিত নয়। আপনি যা ডেলিভারি করছেন তার সম্মান করুন, বিশেষ করে যদি সেটা খাবার হয় বা এমন কিছু হয় যা সহজে ভেঙে যায়।
আহসান শামীমের সেলসে সফল হওয়ার গল্প
অনেক আগে, ১৯৯৮ সালের কথা, তখন সব কিছু অন্যরকম ছিল। তখন কোনো স্মার্টফোন ছিল না, আর রিকশা ভাড়া ছিল মাত্র ৫ থেকে ২০ টাকা!
শামীম স্যার সবসময় নতুন কিছু শিখতে চাইতেন। একবার তিনি একটা হাসপাতালে মাত্র সাত দিন কাজ করেছিলেন। কারণ তিনি ফটোকপি আর ফ্যাক্স মেশিন চালানো শিখতে চেয়েছিলেন!
রক্ত দেখতে তার ভালো লাগতো না, তাই তিনি তাড়াতাড়ি সেই চাকরি ছেড়ে দেন।
একদিন, স্কুলের বড় পরীক্ষা শেষ করার পর তিনি বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার বাবা তাকে বললেন যে, ভ্যানটেজ গ্রুপ নামের একটা কোম্পানিতে তার চাকরির ইন্টারভিউ আছে। শামীম মোটেও ভয় পাননি। ইন্টারভিউতে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো তিনি কত টাকা বেতন চান, তিনি বললেন, “আপনারা যা খুশি দিতে পারেন, স্যার!” এমনকি তার বসকে সুনামগঞ্জে তার গ্রামের বাড়িতে বড় মাছ খাওয়ার দাওয়াতও দিয়ে দিলেন তিনি!
তিনি চাকরিটা পেয়ে গেলেন, আর তার বেতন হলো ৪,০০০ টাকা। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন “মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ” মানে সুন্দর অফিসে বসে কফি খাওয়া আর অন্যদের অর্ডার দেওয়া। তার বদলে, তাকে দিনের পর দিন ফ্যাক্টরিতে গিয়ে শিখতে হতো ভোল্টেজ স্টেবিলাইজারের মতো মেশিন কীভাবে কাজ করে। তারপর তাকে মানুষের দরজায় দরজায় হেঁটে, অনেক সিঁড়ি ভেঙে কোম্পানির জিনিসের কাগজ বা লিফলেট দিতে হতো।
তাকে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টা অফিসে যেতে হতো! কড়া রোদে হেঁটে হেঁটে তার গায়ের রং একদম কালো হয়ে গিয়েছিল, আর সেটা দেখে তার মা খুব অবাক হয়েছিলেন।
কাজটা খুব কষ্টের হলেও শামীম হাল ছাড়েননি। তিনি সবসময় তার কাস্টমারদের ফোন করে জানতে চাইতেন তারা মেশিন নিয়ে খুশি কি না। তার ভালো ব্যবহার আর পরিশ্রমের জন্য সবাই তাকে পছন্দ করতো!
এই কঠোর পরিশ্রমের ফলেই তিনি একটা বিশাল বড় অর্ডার পান, আর একজন সফল সেলসম্যান হয়ে ওঠেন!
বড় বড় ডেলিভারি কোম্পানির অবাক করা দুনিয়া
আপনি কি জানেন, কম্পিউটারে অর্ডার করা একটা খেলনা কীভাবে আপনার বাসায় এসে পৌঁছায়?
এটা “লজিস্টিকস” নামের বিশাল একটা সিস্টেমের মাধ্যমে হয়।
লজিস্টিকস মানে শুধু ট্রাক বা প্লেন চালানো নয়। এটা অনেক বড় একটা কাজ, যেখানে জিনিসপত্র প্যাকেট করা, গুদামে রাখা, আলাদা করা এবং ডেলিভারি দেওয়ার মতো অনেকগুলো ধাপ থাকে।
শামীম স্যার ইউপিএস (UPS) নামের আমেরিকার একটা অনেক বড় ডেলিভারি কোম্পানিতে কাজ করতেন! ইউপিএস ১০০ বছরেরও বেশি পুরোনো! ১৯০৭ সালে দুই ছেলে সাইকেলে করে খাবারের বাটির মতো ছোট জিনিস ডেলিভারি দিয়ে এর শুরু করেছিল। আর এখন, সারা পৃথিবীতে মানুষের পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাদের শত শত প্লেন আছে।
শামীম স্যার বলেছিলেন, বড় বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো খুব দারুন সব প্রযুক্তি ব্যবহার করে। অনেক আগে, ২০০১ সালের দিকেই ইউপিএস কর্মীদের হাতে বিশেষ লেজার স্ক্যানার থাকতো। যখন তারা কোনো বাক্স হাতে নিত, তারা একটা বারকোড স্ক্যান করতো। সাথে সাথেই কম্পিউটার জেনে যেত বাক্সটা কোথায় আছে, আর কাস্টমারও তা ট্র্যাক করতে পারতো!
এই বড় কোম্পানিগুলোর খুব সুন্দর স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটিক) হাব আছে, যেখানে মেশিনগুলো দ্রুত বাক্স আলাদা করতে সাহায্য করে যাতে সেগুলো হারিয়ে না যায়। তারা প্রতিটি পার্সেল খুব যত্ন করে ছোট বাচ্চার মতো আগলে রাখে, যাতে কোনো কিছু ভেঙে না যায়।
তবে কিছু জায়গায়, আমাদের দেশি ডেলিভারি ব্যবস্থা এখনো এতোটা উন্নত নয়। অনেক সময় লোকাল ডেলিভারি ম্যানরা সাইকেলে করে আসে, কিন্তু বাক্স নিরাপদে রাখার জন্য তাদের কাছে ভালো কোনো ব্যাগ থাকে না। কখনো কখনো খারাপ লোকেরা আসল জিনিসের বদলে নকল জিনিস ফেরত দিয়ে দেয়! এছাড়া, বড় বড় গ্লোবাল কোম্পানিগুলোর মতো লোকাল কোম্পানিগুলোর কাছে অনেক সময় দ্রুত গতির কম্পিউটার বা ট্র্যাকিং সিস্টেম থাকে না।
কিন্তু দিন দিন সব কিছুর উন্নতি হচ্ছে! বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে দেখে দেশি ব্যবসাও ধীরে ধীরে ভালো প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখছে, যাতে আপনার পার্সেল নিরাপদে আর তাড়াতাড়ি আপনার কাছে পৌঁছায়।
